জমিতে বিনিয়োগ: সঠিক জমি চেনার উপায় ও লাভজনকতা

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশী টাকাকে পৃথিবীর অন্যান্য মুদ্রার সাথে তুলনা করলে তুলনা করলে, এটা নির্দিষ্ট হয়ে যায় যে বাংলাদেশে টাকার মান দিন দিন কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে আপনি যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের সাথে বাংলাদেশের মুদ্রার তুলনা করেন তাহলে সেটি খুবই স্পষ্ট হয়ে যাবে।

বিষয়টা এরকম যে ২০২০ সালে, যেখানে প্রতি ডলারের বিনিময়ে বাংলাদেশি টাকার পরিমান ছিল ৮৪ টাকা বা তার আশেপাশে, সেখানে ২০২৫ সালের প্রতি ডলারের বিনিময়ে আপনাকে খরচ করতে হবে, ১২০ টাকা বা তার চেয়েও বেশি।

সেক্ষেত্রে, আপনি যদি ব্যাংকে টাকা জমা রাখেন তাহলে সেটি আপনার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টা এরকম যে আপনি বর্তমান সময়ে ব্যাংকে যত টাকা রাখছেন ঠিক এক বছর পরে টাকার পরিমান ঠিক হয়ে থাকবে কিন্তু টাকার মান তুলনা মূলক ভাবে অনেকাংশে কমে যাবে।

এ বিষয়টি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মুদ্রাস্ফীতি। সেজন্য আপনাকে এরকম একটি জায়গায় বিনিয়োগ করতে হবে যেখানে বিনিয়োগ করলে আপনার টাকা পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে।

বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন সেক্টর বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে থেকে অন্যতম হলো জমিতে বিনিয়োগ করা, বা ইংরেজিতে যেটিকে ল্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বলে। এটি হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি লাভজনক উপায় যা সঠিক পরিকল্পনা ও বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে করলে ভালো রিটার্ন নিশ্চিত করা যায়।

তবে একজন নতুন ল্যান্ড ইনভেস্টার হিসেবে আপনাকে বেশ কিছু বিষয় মাথায় রাখতে হয় এবং বেশ কিছু বিষয় পর্যালোচনা করে আপনি এই সেক্টরে, ইনভেস্টমেন্ট করতে পারে।

আজকের এই আর্টিকেলে, এই সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য আলোচনা করা হবে এবং দেখানো হবে কিভাবে আপনি চাইলে জমিতে বিনিয়োগ করতে পারেন এবং এমনভাবে বিনিয়োগ করতে পারেন, যাতে করে আপনি আসলেই লাভবান হবেন।

সঠিক জমি চেনার উপায়

যেকোনো একটি সেক্টর থেকে আপনি যদি লাভবান হতে চান, তাহলে আপনাকে অবশ্যই সেই সেক্টরের প্রত্যেকটি বিষয় সম্পর্কে সূক্ষ্ম ধারণা অর্জন করতে হবে, এবং এর বিকল্প এটি নয়।

অর্থাৎ আপনি যদি জমিতে বিনিয়োগ করার মাধ্যমে ভালো রিটার্ন পেতে চান, তাহলে আপনাকে সঠিক জমি চেনার উপায় সম্পর্কে তথ্য বিষয়ে অবগত হতে হবে।

সঠিক জমি চেনার উপায় হিসেবে যে সমস্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখা যেতে পারে সেগুলো হল:

অবস্থান যাচাই

আপনি যখন জমি ক্রয় করতে চাইবেন কিংবা জমিতে বিনিয়োগ করতে চাইবেন তখন আপনাকে অন্যতম যে বিষয়ের প্রতি নজর রাখতে হবে সেটি হল অবস্থান যাচাই করা।

অর্থাৎ আপনি যে জমি কিনবেন সেই জমির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আপনাকে নিশ্চিত হতে হবে। ভালোভাবে লাভবান, হওয়ার ক্ষেত্রে জমির অবস্থান যাচাই করার জন্য যে সমস্ত বিষয়ে মাথায় রাখা যেতে পারে সেগুলো ভালো:

শহরের কেন্দ্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থান

অন্যতম প্রধান বিষয় হলো শহরের কেন্দ্র কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থানে জমি ক্রয় করা। কারণ এই সমস্ত জায়গাগুলোতে জমি বেশি লাভজনক হয়ে থাকে। বিষয়টা এরকম যে, দেখা যেতে পারে আপনি আজকে একটি জমি ১ লক্ষ টাকা দিয়ে ক্রয় করেছেন, কিন্তু আগামীকাল আপনি সেই একই জমি ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকায় বিক্রয় করতে পারেন।

সেজন্য শহরের কেন্দ্র বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কাছাকাছি জমিগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে।

রাস্তাঘাট হাসপাতাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাজারের সংযুক্ত

আপনি যদি এরকম কোন একটি জায়গা কিংবা ভুৃমি ক্রয় করেন, যে সমস্ত জায়গার সংযুক্তস্থল রাস্তাঘাট হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং বাজারের কাছাকাছি তাহলে সেই জমি তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক।

বিশেষ করে, যখনই যে কেউ কোন জমি ক্রয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে তখন তারা এই সমস্ত জমি ক্রয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করে যে সমস্ত জমি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা হাসপাতাল অথবা একটি শহরের আশেপাশে হয়ে থাকে।

এবং যে সমস্ত ব্যক্তিবর্গরা এই সমস্ত জায়গা ক্রয় করেন, তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকে হয়তো তারা নিজের জন্য বাড়ি তৈরি করবেন কিংবা কোন একটি অ্যাপার্টমেন্ট বা বিল্ডিং তৈরি করবে। অথবা একটি শিল্প কারখানা তৈরি করার ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেন।

সেজন্য যে কোন সময়ের ক্ষেত্রে এই সমস্ত জায়গা ডিমান্ড সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এ সমস্ত জায়গায় বিনিয়োগ করতে পারেন।

শিল্পাঞ্চল বা নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের আশেপাশে

এছাড়াও শিল্পাঞ্চল বা নতুন অবকাঠামো প্রকল্পের আশেপাশের এলাকা ভবিষ্যতের জন্য তুলনামূলক অনেক বেশি লাভজনক। যদিও এই সমস্ত পাশাপাশি এলাকার দাম তুলনামূলক বেশি হবে, তাও আপনি যদি কষ্ট করে বিনিয়োগ করেন, তাহলে সেটি আপনার জন্য ভবিষ্যতের সফলতা বয়ে আনবে।

জমির দলিল ও বৈধতা পরীক্ষা

যখন আপনি একটি জমি নির্বাচন করে নেবেন, তারপরে অন্যতম প্রধান এবং একমাত্র প্রধান বিষয় হলো জমির দলিল এবং বৈধতা পরীক্ষা করা। কারণ জমি ক্রয় করার ক্ষেত্রে এই সমস্যার মধ্যে প্রায়-প্রত্যেকেই থেকেই পড়ে থাকেন।

আপনি যদি জমির দলিল এবং বৈধতা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন তাহলে টাকা বিনিয়োগ করবেন কি করে কিন্তু প্রত্যেকটি টাকা আপনি লস খাবেন। এরকম ঘটনা হয়ে থাকে, যে কেউ আপনাকে ভুয়া দলিল দেখিয়ে অন্যের টাকা বিক্রি করে দিবে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন সঠিক দলিল চলে আসবে তখন জায়গায় আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে।

সেজন্য ভালোভাবে জমির, বৈধতা পরীক্ষা করুন। জমির বৈধতা পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে যে সমস্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখা যেতে পারে সেগুলো হল:

  • জমির মালিকানা যাচাই করতে: খতিয়ান, পর্চা, দাগ নম্বর ও নামজারি পরীক্ষা করুন। আপনি চাইলে অনলাইনের মাধ্যমে কিংবা ভূমি অফিসে গিয়ে সেটি যাচাই করে নিতে পারবেন।
  • জমিটি কোনো মামলা বা বিরোধে জড়িত কি না তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ভূমি অফিস ও আইনজীবীর পরামর্শ নিন।
  • ভূমি উন্নয়ন কর (খাজনা) পরিশোধ করা হয়েছে কিনা চেক করুন।

জমির প্রকার ও ব্যবহারযোগ্যতা

বিভিন্ন প্রকারের জমি হয়ে থাকে। এর মধ্যে কত জমি রয়েছে যেগুলো কৃষিকাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এছাড়াও এরকম বমি রয়েছে যেগুলো মূলত বাণিজ্যিক জমি।

সেজন্য আপনাকে কিছু জমি আবাসিক জমি এবং বাণিজ্যিক জমির মধ্যে পার্থক্য বুঝে বিনিয়োগ করতে হবে। এই তিনটি প্রকারভেদের মধ্যে থেকে আপনি যদি বাণিজ্যিক জমির মধ্যে ইনভেস্টমেন্ট করেন তাহলে আপনি সবচেয়ে বেশি বেনিফিট পাবেন।

তবে বাণিজ্যিক জমিতে ইনভেস্টমেন্ট করার ক্ষেত্রে আপনার ইনভেসমেন্ট এর পরিমাণ অনেক বেশি থাকতে হবে। এর বিপরীতে আপনি যদি কৃষি জমিতে বিনিয়োগ করেন তাহলে আপনি কম ইনভেস্টমেন্টে সেখানে বিনিয়োগ করতে পারেন। তবে এখান থেকে আপনি আস্তে আস্তে প্রফিট পাবেন।

এছাড়াও জমি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে অবশ্যই, জলাবদ্ধতা বা বন্যাপ্রবণ এলাকা কিনা তা নিশ্চিত করুন। কারণ জলাবদ্ধতা বা বন্যা প্রবণ এলাকায় জমির দাম তুলনামূলক কম হয়ে থাকে।

ভবিষ্যৎ মূল্য বৃদ্ধি সম্ভাবনা

আপনি যে জায়গাতে বিনিয়োগ করবেন সেই জায়গার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য বেশ কিছু বিষয়ের উপর সেটি নির্ভর করবে। ভবিষ্যতের মূল্য বৃদ্ধি সম্ভাবনা যে সমস্ত বিষয়ের উপরে নির্ভর করে সেগুলো হল:

নতুন রাস্তা, মেট্রো রেল, ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন বা শহরের সম্প্রসারণ প্রকল্প থাকলে জমির দাম বাড়বে।

এছাড়াও, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ বিবেচনা করুন।

জমিতে বিনিয়োগের অন্যতম সুফল

যখন আপনি জমিতে বিনিয়োগ করবেন তখন বিভিন্ন উপায়ে আপনি সেই জমি থেকে আয় করতে পারবেন। মোটকথা হলো আপনার জমি ঠিক জায়গায় থাকবে শুধুমাত্র আপনি এই জমি ব্যবহার করার মাধ্যমে আয় করতে পারবেন।

যেভাবে একটি জমি কে ঠিক রেখে আয় করা যেতে পারে, সে সমস্ত বিষয় গুলো হলো:

ভাড়া এবং লিজ থেকে আয়

বাণিজ্যিক বা আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুললে ভাড়া থেকে নিয়মিত আয় পাওয়া যায়। মোটকথা হল এই সমস্ত বিষয়ে আপনার জমি একই জায়গায় থাকবে এবং আপনি প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণে ভাড়া পাবেন, যা থেকে আপনার আর হবে।

সেক্ষেত্রে আপনি চাইলে নিজে থেকে বাণিজ্য কিংবা আবাসিক প্রকল্প গড়ে তুলতে পারেন অথবা অন্য কাউকে লিজ দিতে পারেন।

এছাড়াও আপনি যদি বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রে কিছু জমিতে বিনিয়োগ করেন তাহলে, কৃষি জমি লিজ দিয়ে আয় করা সম্ভব।

এছাড়াও, জমি প্লট আকারে বিক্রি করে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়।

এছাড়াও আপনি যদি সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারেন এবং একই সাথে সঠিকভাবে ম্যানেজমেন্ট করতে পারেন তাহলে জমিতে আপনি ভবিষ্যতের জন্য এবং একই সাথে বর্তমানের জন্য লাভবান হবেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top