সময় যত উন্নত হচ্ছে এবং আমরা যত বেশি ডিজিটাল জগতে উপনীত হচ্ছি তত বেশি অপরাধের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় অন্যতম একটি ভয়ানক হুমকি হলো সাইবার ক্রাইম।
যে বা যারা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে প্রচারণ করছেন কিংবা ডিজিটাল সেবা উপভোগ করছেন তাদের জন্য এটি একটি অন্যতম বিষফোড়া। ডিজিটাল যুগের হ্যাকিং, ফিশিং, পরিচয় চুরি, ব্যাংকিং জালিয়াতি, সাইবার বোলিং অডিজিটাল প্রতারণার মত অপরাধ থেকে আমাদেরকে নিরাপদ থাকতে হবে।
এবং এ সমস্ত বিষয়গুলো থেকে নিরাপত্তা কার জন্য আমাদেরকে অবশ্যই সচেতন এবং আইনি ব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে হবে। এই আর্টিকেলে কিছু বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে জেনে নিলে আপনি সাইবার ক্রাইম থেকে বেঁচে থাকতে পারবেন।
তাহলে আর দেরি না করে এখনি শুরু করা যাক।
সাইবার ক্রাইম থেকে বাঁচতে করণীয়
আপনি যদি সাইবার ক্রাইম থেকে বেঁচে থাকতে চান, তাহলে সাইবার ক্রাইম থেকে বেঁচে থাকতে হলে আপনাকে বেশ কিছু বিষয়ে ধারণা অর্জন করতে হবে।
যে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে এবং যে সমস্ত পদক্ষেপ অর্জন করতে হবে সেগুলো হলো:
একাউন্টের জন্য শক্তিশালী পাসপোর্ট নির্বাচন করা
যে কোন একাউন্টের জন্য আপনাকে অবশ্যই একটি শক্তিশালী এবং অন্যান্য একাউন্ট এর চেয়ে আলাদা ও জটিল পাসওয়ার্ড এর নির্বাচন করতে হবে। কারণ আপনার ডিজিটাল একাউন্টের অন্যতম এবং প্রধান সুরক্ষা হল একাউন্টের পাসওয়ার্ড।
কেউ যদি আপনার একাউন্টের পাসওয়ার্ড জেনে নিতে পারে তাহলে সে সহজেই আপনার একাউন্টের অ্যাক্সেস নিতে পারবে এবং আপনার অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারবে এবং আপনাকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারবে।
সেজন্য একাউন্টের জন্য অবশ্যই সঠিক এবং শক্তিশালী পাসওয়ার্ড নির্বাচন করুন।
একাউন্টের জন্য পাসওয়ার্ড নির্বাচন করার ক্ষেত্রে যে সমস্ত বিষয়ে নজর রাখতে পারেন সেগুলো হল:
- প্রতিটি অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড আলাদা এবং জটিল হতে হবে।
- প্রতিটি অ্যাকাউন্টের জন্য আলাদা ও জটিল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন।
- পাসওয়ার্ডে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করুন।
- নিয়মিত পরিসরে পাসওয়ার্ড পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং দুই স্তরের নিরাপত্তা (Two-Factor Authentication) চালু রাখুন।
এছাড়াও, আপনি যদি একটি শক্তিশালী নির্বাচন করতে চান তাহলে বিভিন্ন রকমের টুলস ব্যবহার করতে পারেন যেগুলোর মাধ্যমে পাসওয়ার্ড জেনারেট করতে পারবেন। এবং জেনারেট করার পাসপোর্ট এর সাথে আপনি চাইলে আরো কয়েকটি ক্যারেক্টার সম্পৃক্ত করে, পাসওয়ার্ড কে আরো বেশি শক্তিশালী করতে পারবেন।
সন্দেহজনক লিংক ও ইমেল এড়িয়ে চলুন
আপনি যখনই ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের পদাচরণ করবেন তখন আপনাকে বিভিন্ন রকমের লিংকের সম্মুখীন হতে হবে। এরকম দেখা যেতে পারে যে কেউ আপনাকে কোন একটি লিংক প্রেরণ করল এবং আপনি তাতে প্রবেশ করে ফেললেন।
এবং যখনই আপনি ওই ব্যক্তির দেয়া লিঙ্কে প্রকাশ করলেন তারপরে আপনার অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গেল, বা আপনার তথ্য চুরি হয়ে গেল। সেজন্য সন্দেহভাজন লিঙ্ক এবং ইমেইল এড়িয়ে চলতে হবে।
যে সমস্ত বিষয়গুলো জেনে রাখা ভালো সেগুলো ভালো:
- অপরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আশা ইমেইল বা মেসেজের লিঙ্কে কখনোই ক্লিক করবেন না৷
- ব্যাংক কিংবা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম করে আসা ফিশিং ইমেইল লিংক আসলে সে বিষয়ে ভালোভাবো জানার চেষ্টা করতে হবে এবং এ সমস্ত ইমেইলে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
- যে কোন অপরিচিত ওয়েবসাইট এবং দেখতে সন্দেহজনক মনে হয়, এই সমস্ত ওয়েবসাইটে বিভিন্ন রকমের ব্যক্তিগত তথ্য এবং ব্যক্তির ডিটেলস প্রদান করা থেকে বিরত থাকবেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিরাপত্তা বজায় রাখুন
যখনই আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করি, তখন আমরা চাইলে আমাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রাইভেসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। যদি আমরা পুরোটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না তারপরও আমরা আমাদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য যতটুকু নিরাপত্তা দেয়া প্রয়োজন সেটি আমরা দিতে পারি।

জনপ্রিয় সোশ্যাল গণমাধ্যম হিসেবে facebook, instagram এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্রাইভেসি সেটিং ঠিকভাবে কনফিগার করতে পারেন। এবং এখানে আপনার যে সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য রয়েছে, যেমন জাতীয় পরিচয় পত্র, ফোন নাম্বার, ঠিকানা ইত্যাদি পাবলিক প্রোফাইলে শেয়ার করবেন না৷
এছাড়াও যে কোন সোশ্যাল গণমাধ্যমে যখন আপনি সম্পৃক্ত হবেন তখন আপনি সেখানে বিভিন্ন বন্ধুবান্ধব আপনার একাউন্টে সম্পৃক্ত করতে পারবেন। বন্ধুবান্ধব এর সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই অপরিচিত বন্ধুদের অনুরোধ গ্রহণ করার আগে ভালোভাবে যাচাই করে নিবেন।
আপনার ডিভাইস আপডেট রাখুন
আপনি বর্তমান সময়ে যে ডিভাইস কিংবা সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন সেই ডিভাইস এবং সফটওয়্যার কে সবসময় আপডেট করে রাখুন। কোন নতুন আপডেট চলে আসলে সেটি আপডেট করে ফেলুন এবং আপটুডেট থাকুন।
এ ছাড়া আপনি চাইলে বিভিন্ন রকমের এন্টিভাইরাস সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন, যেগুলো নিয়মিত আপডেট করার মাধ্যমে আপনার নির্দিষ্ট ডিভাইস সুরক্ষিত রাখতে পারেন।
আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে সর্তকতা
আপনি চাইলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যে কোন ই-কমার্স ওয়েবসাইট ব্যবহার করার মাধ্যমে বিভিন্ন রকমের পণ্য কিংবা আপনার প্রয়োজনীয় বিষয়ের উপরে করতে পারেন। তবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে আর্থিক পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
যখন আপনি কোন একটি ওয়েবসাইটে পেমেন্ট করবেন, তখন এটা নিশ্চিত হয়ে যাবেন আপনি যে ওয়েবসাইটি পেমেন্ট করছেন সেই ওয়েবসাইট আসলেই বিশ্বস্ত। ওয়েবসাইটের বিশ্বস্ততা যাচাই করে নেয়া অনেকগুলো অপশন রয়েছে।
এর মধ্যে থেকে অন্যতম একটি অপশন হল, Trust pilot প্লাটফর্মে ভিজিট করার মাধ্যমে এবং লিংক দেয়ার মাধ্যমে কিংবা ইন্টারনেটে আপনি যেই ওয়েবসাইটি পেমেন্ট করতে চান সেই ওয়েবসাইটের সাথে, review সম্পৃক্ত করে দিয়ে তার রিভিউ দেখে নিতে পারেন।
এছাড়া কোন একটি ওয়েবসাইটে পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে অবশ্যই ওয়েবসাইটে ইউআরএল যাচাই করে নিবেন৷ যদি “https://” দিয়ে শুরু না হয়, তবে সেটি নিরাপদ নয়।
এছাড়াও কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুরোধে ব্যাংকিং তথ্য শেয়ার করার আগে দুইবার চিন্তা ভাবনা করে শেয়ার করবেন। কিংবা শেয়ার করার বিপরীতে সেটি যাচাই করে তারপরে শেয়ার করবেন, অথবা যদি সন্দেহজনক মনে হয় তাহলে শেয়ার করবেন না।
সন্দেহজনক আচরণ দেখলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন
যখন আপনি কোন একটি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করবেন কিংবা আপনার ইমেইল অথবা ব্যাংক একাউন্ট হ্যাক হয়ে যাবে, অথবা আপনি এটি মনে করবেন যে আপনার অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন হয়ে গেছে কিংবা আপনার একাউন্ট থেকে আন-অথরাইজ অ্যাক্টিভিটি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তখনই আপনাকে অবশ্যই দ্রুততার সাথে পদক্ষেপ নিতে হবে।
সন্দেহজনক আচরণ দেখলে যে সমস্ত পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সেগুলো হল:
সাথে সাথে আপনার একাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন এবং কর্তৃপক্ষকে জানান।
যদি আপনি একাউন্টের পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করতে অক্ষম হন, তাহলে দ্রুত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহায়তা নিতে পারেন। তাই আপনি বাংলাদেশ সরকারের তৈরি করা সংবিধানে যে আইন রয়েছে, সেই আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন।
বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ কার্যকর রয়েছে। এই আইনের আওতায় সাইবার ক্রাইমের শিকার হলে নিচের ব্যবস্থা নিতে পারেন:
সর্বপ্রথম পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটি অভিযোগ জানাতে পারেন। বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল বা সাইবার পুলিশ সেন্টার (CPC)এ অভিযোগ করতে পারেন। অথবা সংশ্লিষ্ট থানায় বা ৯৯৯-এ কল করে সাহায্য নিতে পারেন।
এছাড়াও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে রিপোর্ট করতে পারেন। যে কোন অনলাইন প্লাটফর্মে হয় রানী বা প্রতারণার শিকার হলে আপনি বিটিআরসি তে অভিযোগ দাখিল করতে পারেন।
এছাড়াও এই সম্পর্কে আপনি আইনি লড়াইয়ে লড়তে পারবেন। আপনি চাইলে বাংলাদেশের অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দাখিল করতে পারবেন এবং তারপরে আপনার তথ্য পুনরায় পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রসর হতে পারবেন। এবং একই সাথে যে ব্যক্তি অপরাধ করেছেন, তাকে নির্দিষ্ট আইনের অধীনে সাজা দিতে পারবেন।